‘সবসময় মানুষ ভয় পাওয়ার জন্য তৈরি থাকে। শুধু দরকার একজন ভয় দেখানোর লোকের। আর সেই লোকটা হলাম আমি, বিনাশ রাও।‘
সতেরো বছর আগে বিজয় থালাপতির এক সিনেমার ডায়লগ এটা। হিন্দিতে ডাব করা সিনেমার নাম ডেঞ্জারাস খিলারি ৩। মূল সিনেমা তামিল ভাষায়। ভেট্টাইকারান।
ভয়।
ডর।
ওই সিনেমায় ভয় ভাঙার স্ক্রিপ্ট ছিল অনেকই সহজ।
আরও ভয়।
ভিলেন সেলিম ঘাউসের অসামান্য অভিনয় ছিল ওই সিনেমার সম্পদ। সিনেমায় তার তৈরি করা যাবতীয় ভয় উড়িয়ে দিয়েছিল এক সাধারন ছেলে। বলা বাহুল্য বিজয় ওই চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। সাধারন ওই যুবক স্রেফ ভিলেনের ওষুধ ‘ভয়’কে ভয় পাইয়ে দিয়েছিল। আর তাতেই কাম ফতে।
কিন্তু যন্তর মন্তরে পুলিশের লাঠি ডাণ্ডা, পেলেট গানের গুলি – এসবের ভয় কাটানোর জন্য কোনও মারপিট করতে হয়নি।
শুদ্ধু আঠেরো নেমে এসেছিল যন্তর মন্তরে।
কবে লিখেছিলেন সুকান্ত?
“এ দেশের বুকে আঠেরো আসুক নেমে?”
ভারতের স্বাধীনতার মাত্র তিন মাস আগে সুকান্ত মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয় ‘ছাড়পত্র’।
মানে ভারতের স্বাধীনতার আগেই সুকান্ত সেই কবে লিখে গেছেন, এ দেশের বুকে আঠেরো আসুক নেমে।
সেই আঠেরো তথা জেন জি-ই কী ভয় ভাঙিয়ে দিল সবার?
একেই কী বলে স্বপ্নদ্রষ্টা কবি?
আমরা এখন দিবারাত্র জেন জি জেন জি করছি। এই তো এরা আশপাশেই ছিল, এখনও আছে। মাত্র একশো দিন আগেও তো বোঝা যায় নি, এমন এক পারমানবিক শক্তি লুকিয়ে রয়েছে আমাদের সমাজ ও সংসারে?
কিন্তু “জেন জি”-র আসল বৈশিষ্ট্য কী?
শুধুই জমায়েত হয়ে, গান বাজনা করে তারা জিতে গেল? তা তো নয়।
আসলে এরাই সেই প্রথম প্রজন্ম, যারা ডিজিটাল দুনিয়ার মধ্যেই জন্মেছে। আলাদা করে ডিজিটাল দুনিয়ার মধ্যে ঢোকেনি।
এর আগের প্রজন্ম তথা মিলেনিয়াল প্রজন্ম ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন আসার পর সেগুলো নিতে শিখেছে।
মানে মিলেনিয়ালরা প্রযুক্তির সঙ্গে বড় হয়েছে। জেন জি প্রযুক্তির ভিতরেই বড় হয়েছে।
জেন জি-র ক্ষেত্রে স্মার্টফোন, ওয়াই-ফাই, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ইচ্ছেমতো যখন-তখন বিনোদন, এসব ছোটবেলা থেকেই তাদের জীবনের স্বাভাবিক অংশ।
প্রযুক্তি তাদের কাছে জলভাত। প্রযুক্তি তাদের কাছে আলাদা কোনও “প্রযুক্তি” নয়। এটা রোজকার রুটিন।
এই প্রযুক্তিরই কথা নাকি এখন বলছেন মোদী। অন্যদের সক্রিয় হতে বলছেন এই দুনিয়ায়।
নিজেও নেমে পড়েছেন ইন্সটাগ্রামে।
আর নামার সঙ্গে সঙ্গেই যা হয়েছে, তার তুলনা দিতে হয় ক্রিকেট খেলার উদাহরন দিয়ে। অস্ট্রেলিয়ার সবুজ পিচে একদা সুনীল গাভাসকরদের জন্য সাজানো থাকতো ভয়ংকর ফাস্ট পিচ। তখন বোলারদের হাত পা বেঁধে দিয়ে বলির ছাগল বানানো হয় নি। সবুজ পিচে লিলি টমসনরা আগুন ঝড়াতেন। গাভাসকরদের থুতনির কোল ঘেঁষে ছুটে যেত লাল বল। সাহেবরা এই আক্রমনের নাম দিয়েছিল, চিন মিউজিক। চিন, মানে থুতনি।
জেন জির সঙ্গে বেশি মাখামাখি করতে গেলে ওই চিন মিউজিক শুনতেই হবে নিশিকান্ত দুবে, কঙ্গনা বা নীতিন নবীনদের।
যন্তর মন্তরে দেখা গেছে অসংখ্য ভিডিও। কারন কী?
কারন এই সব ভিডিও, ছবি এবং ছোট দৈর্ঘ্যের দ্রুতগতির বিষয়বস্তুর সঙ্গে জেন জির স্বাভাবিক যোগাযোগ।
ইন্টারনেট কাট করে তাদের দমিয়ে রাখাও মুশকিল ছিল। হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে দিল্লি পুলিশ।
কারন আর কিছুই নয়।
ওরে ভাই, এরা তো অনলাইন আর বাস্তব জীবনকে অনেক সময় আলাদা দুটো জগৎ হিসেবেই দেখে না। এরা অত্যন্ত দ্রুত তথ্য গ্রহণ করতে পারে। এরা বৈচিত্র্য ভালবাসে স্বাভাবিক জীবনের মতো। ভারতের মতো বৈচিত্র্যশালী দেশের জন্য এরা যে জন্মগত ভাবে সবচেয়ে উপযুক্ত, তা নিয়ে কোনও তর্ক করে লাভ নেই।
আমেরিকার এক স্বাধীন রিসার্চ সেন্টার আছে। তার নাম পিউ রিসার্চ সেন্টার। পিউ রিসার্চ মানুষের মতামত, সামাজিক পরিবর্তন, জনসংখ্যা, রাজনীতি, প্রযুক্তি ইত্যাদি নিয়ে সমীক্ষা ও পরিসংখ্যানভিত্তিক গবেষণা করে। মানুষের চিন্তাভাবনা ও সামাজিক পরিবর্তন নিয়ে বড় মাপের গবেষণা ও সমীক্ষা করে এমন একটি প্রতিষ্ঠান।
সেই পিউ রিসার্চ বলছে, জেন জি আগের প্রজন্মগুলোর তুলনায় বেশি জাতিগত ও সামাজিক বৈচিত্র্যের পরিবেশে বড় হয়েছে। এরা সামাজিক বৈচিত্র্যের প্রতি তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি ইতিবাচক।
করোনা মহামারি, জলবায়ু নিয়ে উদ্বেগ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক মেরুকরণ - এসব তারা বড় হতে হতে দেখছে। মোদী সরকারের গত বারো বছরে তাদের বয়সও বেড়েছে বারো বছর।
কী দেখেছে তারা? এই কবছরে?
প্রশ্নহীন এক তাজ্জব রাজনীতি!!!
পৃথিবীতে এমন কেউ আজ পর্যন্ত পয়দা হয়েছে নাকি, যাকে প্রশ্ন শুনতে হয় না? আরে, মা বাবার কাছে ছেলে মেয়েকে শুনতে হয়। ছেলে মেয়ের কাছে মা বাবাকে শুনতে হয়। স্কুল কলেজে প্রশ্ন না করলে তো পড়াশোনাই লাটে উঠে যাবে।
প্রশ্ন ছাড়া চাকরি হয়? ব্যবসা হয়? ডাক্তার প্রশ্ন করবে না? উকিল কিংবা ইঞ্জিনিয়ার?
সবাই প্রশ্ন করবে। তাহলে সাংবাদিকেরা কেন করবে না? আম কেটে খান না চুষে খান – এটা সাংবাদিকের প্রশ্ন নয়। আপনি এত এনার্জি পান কোথা থেকে? এটাও কোনও প্রশ্ন নয়। এগুলো বিশুদ্ধ তৈল দান।
সুতরাং যন্তর মন্তরে ‘প্রশ্ন কেন করা হবে না’, এই প্রশ্নও তো করতে এসেছিল তারা।
আর একটা মজার ব্যাপার।
জেন জি-র জন্মসীমা নিয়েও গবেষকদের মধ্যে পুরোপুরি ঐকমত্য নেই। আমেরিকার পিউ রিসার্চ সেন্টার ১৯৯৭ সাল থেকে জেন জি ধরছে, আর অস্ট্রেলিয়ার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ম্যাকক্রিন্ডল ১৯৯৫ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত সময়কে জেন জি হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
সে যাইই হোক, মোক্ষম কথাটা দুদিন আগে পুন্য প্রসুন বাজপেয়ী বলেছেন তার ভিডিওতে।
পূন্য প্রসুন বলেছেন, এখন গোটা বিশ্বে ভারতেই রয়েছে সবচেয়ে বড় যুবশক্তি।
এদিকে সরকারকে কেউ এই জ্ঞানও দিয়ে দিয়েছে যে, এই দেশের যুবসমাজ, যাদের গড় বয়স আপনি ২৮ বছর ধরছেন তাদের বিপরীতে দেশের সংসদ ও মন্ত্রীদের গড় বয়স ৫৮ থেকে ৬০ বছর! অর্থাৎ ২৫ থেকে ৩০ বছরের চিন্তাভাবনার যে ফারাক, তার মাঝে পড়ে দেশ আজ এমনভাবে আটকে গেছে …….. ২৫ থেকে ৩০ বছরের বয়সের ব্যবধানের কারণে সংসদ বা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় আজ তরুণদের কোনো প্রশ্নের জবাব দিতে পারছে না।