নিজেকে প্রশ্ন করুন পাঁচ বার। বা সাত দশবার। সমাধান আপনার হাতের মুঠোয় – এটাই বিখ্যাত জাপানি ৫ হোয়াই দর্শন।
ধাঁ ধাঁ করে দ্রুত বদলাচ্ছে পৃথিবী। আমার আপনার চারপাশ। এই সময়ের, দ্রুত পরিবর্তনশীল করপোরেট বিশ্বে আমরা প্রতিদিন অসংখ্য সমস্যার মুখোমুখি হই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমরা সমস্যার উপরিভাগ বা লক্ষণ দেখে দ্রুত একটি সাময়িক সমাধান বা 'ব্যান্ড-এইড' লাগিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলি। রাস্তা ভেঙে গেলে যেটাকে বলে তাপ্পি মারা ইন্ডিয়ান কৌশল!!!
কিন্তু কিছুদিন পর দেখা যায়, সেই একই সমস্যা অন্য কোনো চেহারায় আবার ফিরে এসেছে। আবার তাপ্পির ইন্ডিয়ানে কাজ চলে যায়। কিন্তু আবার, আরও একবার ফিরে আসে ওই সমস্যা। এক বার নয়, বারে বারে ফেরে। এই চক্রাকার ফাঁদ থেকে বাঁচার জন্য জাপানিরা বিশ্বকে শিখিয়েছে এক অসাধারণ জীবনমুখী দর্শন. ৫ হোয়াই (5 Whys) পদ্ধতি। কোনো জটিল ফর্মুলা বা পরিসংখ্যান ছাড়াই, কেবল একটি প্রশ্নকে পরপর পাঁচবার আওড়ে কীভাবে যেকোনো সংকটের আসল কারণ শিকর শুদ্ধ উপড়ে ফেলা যায়, এটি তারই গল্প।
প্রথমে জানা যাক, ইতিহাস ও উৎপত্তির প্রেক্ষাপট
এই দর্শনের বীজ বোনা হয়েছিল জাপানের শিল্প বিপ্লবের রূপকারের হাত ধরে। তিনি টয়োটা গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা সাকিচি তোয়োদা। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে, তাঁত শিল্প দিয়েই কিন্তু সাকিচি শুরু করেছিলেন জীবন। তাঁত থেকে থেকে গাড়ি উৎপাদন!! এমন অদ্ভুত জার্নি কেন? টয়েটা গাড়ির কথা হচ্ছিল, তাঁত এলো কোত্থেকে? কথায় আছে, খাচ্ছিল তাঁতি তাঁত বুনে / কাল হলো তার এঁড়ে গরু কিনে? – এখানে কী সেই গল্প নাকি? না, জাপানে সেটা হয় নি। হ্যাঁ, একদম তাই! সাকিচি তোয়োদার কর্মজীবন এবং আজকের বিশ্ববিখ্যাত টয়োটা সাম্রাজ্যের সূচনা কিন্তু কোনো গাড়ি দিয়ে নয়, বরং কাঠের তৈরি তাঁত শিল্প দিয়ে হয়েছিল। সাকিচি তোয়োদার বাবা ছিলেন একজন কাঠমিস্ত্রি এবং মা ছিলেন তাঁতি। ১৮৯০-এর দশকে জাপানের গ্রামীণ নারীদের অত্যন্ত কষ্ট করে হাতে চালিত তাঁতে কাপড় বুনতে হতো। তার মধ্যে তার মা-ও ছিলেন। তা দেখে সাকিচি ভাবতে শুরু করলেন এর সমাধান। কীভাবে এই পরিশ্রম কমানো যায়।
সেই ভাবনা থেকেই তিনি কাঠের তৈরি এক ধরনের বিশেষ হাতে চালিত তাঁত আবিষ্কার করেন। এবং ওই তাঁত কাপড়ের উৎপাদন ক্ষমতা এক ধাক্কায় পঞ্চাশ শতাংশ বাড়িয়ে দেয়। তাঁর এই তাঁত শিল্পের হাত ধরেই টয়োটার পথচলা কীভাবে আবর্তিত হয়েছিল, তা সত্যিই দারুণ রোমাঞ্চকর এক কাহিনি। কী রকম? ১৯২৪ সালে সাকিচি তাঁর ছেলে কিইচিরো তোয়োদাকে সঙ্গে নিয়ে পৃথিবীর প্রথম সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় তাঁত মেশিন তোয়াদা অটোমেটিক লুম,’ টাইপ জি’ তৈরি করেন। এই মেশিনের দারুন এক বিশেষত্ব ছিল। বোনার সময় কোনো একটা সুতো ছিঁড়ে গেলেই পুরো মেশিনটি নিজে থেকেই তৎক্ষণাৎ বন্ধ হয়ে যেত। এই কাহিনির এটাই প্রথম ট্যুইস্ট। এই যে বলা হলো, 'ত্রুটি হলে নিজে থেকে বন্ধ হওয়া' – এটাই হলো পরবর্তী সময়ে টয়েটার দর্শন। এই দর্শনটিই অনেক পরে টয়োটার বিখ্যাত উৎপাদন ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হয়ে ওঠে। এই দর্শনের নাম 'জিদোকা'। অটোমেশনের জাপানি শব্দ 'জিদোকা’। কিন্তু টয়োটা মানে সাধারণ অটোমেশন নয়। জাপানিরা একে বলে এমন স্বয়ংক্রিয় এক ব্যবস্থা, যা প্রয়োজনে মানুষের মতো ভুল চিনে নিজেই থেমে যেতে পারে। সহজ কথায়, মেশিন নিজে থেকেই ভালো-মন্দের তফাত করতে পারবে এবং কোনো ত্রুটি বা অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই নিজে নিজে থমকে যাবে। এবার আসা যাক ২য় ট্যুইস্টে। তাঁতকল থেকে গাড়ি কারখানায় কেন এলেন তোয়োদা পরিবার? সাকিচি তোয়োদার তৈরি ১৯২৪ সালের সেই বিখ্যাত 'টাইপ জি' স্বয়ংক্রিয় তাঁতকলের নীতিটাই টয়োটা তাদের গাড়ির অ্যাসেম্বলি লাইনে নিয়ে আসে। সেটা কী রকম? তার আগে বুঝে নিই, তাঁতকলে কী হতো। কাপড়ের একটা সুতো ছিঁড়ে গেলেই মেশিন সঙ্গে সঙ্গে খটাস করে বন্ধ হয়ে যেত। ফলে একটাও ত্রুটিপূর্ণ কাপড় তৈরি হতে পারত না। এবং অপারেটরকে সবসময় মেশিনের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকতে হতো না। একজন মানুষ একসাথে অনেকগুলো মেশিন সামলাতে পারতেন। ঠিক সেটাই হলো গাড়ির কারখানায়। টয়োটা তাদের গাড়ির প্রোডাকশন লাইনে প্রতিটি কর্মীর মাথার ওপর একটি করে দড়ি ঝুলিয়ে দিল। যেটিকে বলা হয় 'অ্যান্ডন কর্ড'। নিয়ম করা হলো, কোনো কর্মী যদি দেখেন যে কোনো একটা গাড়ির নাট ঠিকমতো টাইট হয়নি তিনি সঙ্গে সঙ্গে ওই দড়ি ধরে টান দেবেন। বা কোনো যন্ত্রাংশে স্ক্র্যাচ আছে? ব্যস, দড়ি ধরে মারো টান। রাজা খান খান হবে না, কিন্তু দড়ি ধরে টান দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কোটি কোটি টাকার পুরো প্রোডাকশন লাইন এক সেকেন্ডে স্তব্ধ হয়ে যেত!
এই টুইস্টের আসল চমৎকারিত্ব এটাই। সাধারণত যেকোনো বড় কারখানায় প্রোডাকশন লাইন বন্ধ হওয়াকে দূর্ঘটনা বলে মনে করা হয়। কারণ উৎপাদন থামলে কোম্পানির ক্ষতি। কিন্তু টয়োটা এই 'জিদোকা' দর্শনের মাধ্যমে পুরো ধারণাটাই উল্টে দিল। তারা বলল, ত্রুটি হওয়া মাত্রই কাজ থামিয়ে দেওয়া অনেক বেশি পজিটিভ। ত্রুটিপূর্ণ গাড়ি তৈরি করে লাইনের শেষে গিয়ে তা মেরামত করার চেয়ে, এটা অনেক সাশ্রয়ী। এবার মূল প্রসঙ্গে একটু ফেরা যাক। আমরা তো পাঁচ কেন বা হোয়াই-এর এক অসাধারণ জীবনমুখী দর্শনের কথা বলা শুরু করেছিলাম। ঠিক। এবারে ওই প্রসঙ্গে ঢুকে পড়ার প্রেক্ষাপটও তৈরি। সমস্যা যেখানে তৈরি হয়েছে, ঠিক সেখানেই কাজ থামিয়ে ওই '৫ কেন বা হোয়াই’ প্রয়োগ করতে হবে। আর তাতেই বেরিয়ে আসবে সমস্যার মূল কারণ। কারন খুঁজে বের করার কারনও আসলে এক সিগন্যাল। কীসের সিগন্যাল? যেন ওই ভুল জীবনে আর না ঘটে। ভাবুন একবার, এটা ছিল ১৯২০-এর দশকের একটা সুতো-ছেঁড়া আটকানোর জাপানি প্রযুক্তি। সেই প্রযুক্তিই কীভাবে একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বমানের ম্যানুফ্যাকচারিং এবং কোয়ালিটি কন্ট্রোলের ভোল বদলে দিল! কাপড়ের সুতো আর গাড়ির নাট-বল্টু। দুটি ভিন্ন জিনিসকে এক সুতোয় বেঁধে দিয়েছিল এই 'জিদোকা' দর্শন। ১৯২৯ সালে বৃটেনের একটি বিখ্যাত টেক্সটাইল কোম্পানি সাকিচির এই স্বয়ংক্রিয় তাঁতের পেটেন্ট বা মেধা-স্বত্ব কিনে নেওয়ার আগ্রহ দেখায়। সাকিচি সেই পেটেন্ট বিক্রি করে ১ লক্ষ ব্রিটিশ পাউন্ড পান। সাকিচি তোয়োদা কী বুঝতে পেরেছিলেন যে তার ছেলের এবং পরিবারের ভবিষ্যৎ মোটর গাড়ির দিকে ঝুঁকছে? ১৯৩০ সালে তার মৃত্যু হয়। তার আগে তিনি তাঁর ছেলে কিইচিরো তোয়োদাকে সেই পেটেন্ট বিক্রির টাকাটা দিয়ে যান। এবং বলে যান, এই টাকা যেন নতুন কোনো আধুনিক প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করা হয়। বিশেষ করে গাড়ি উৎপাদনের গবেষণায় বিনিয়োগ করলে তার আত্মা শান্তি পাবে। বাবার সেই স্বপ্ন আর পুঁজিতে ভর করেই ১৯৩৩ সালে টয়োটা অটোমেটিক লুম ওয়ার্কসের ভেতরেই একটি ছোট 'গাড়ি উৎপাদন বিভাগ' খোলা হয়। মাত্র কয়েক বছর পর, ১৯৩৭ সালে এই উতপাদন বিভাগ একটি স্বাধীন কোম্পানি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। আজকে আমরা রাস্তায় যে টয়োটা গাড়ি চলতে দেখি, তার পেছনে রয়েছে বিংশ শতাব্দীর শুরুতে এক বাঙালি তাঁতির মতো জাপানি এক কাঠমিস্ত্রির ছেলের তাঁত বোনার সেই অসাধারণ দূরদর্শী প্রচেষ্টা! ঠিক পড়লেন কী? হচ্ছে তো এক প্রবাদ প্রতীম জাপানি যুবকের কথা, সেখানে হঠাত এক বাঙালি এলো কোথা থেকে? প্রিন্টিং মিস্টেক? আজ্ঞে না। গল্পে কোনো বাঙালি চরিত্র নেই। পুরো কৃতিত্বটাই সাকিচি তোয়োদা নামের সেই দূরদর্শী জাপানি যুবকের। আর এই ভুলটা করা হলো ইচ্ছে করেই। আমাদের মূল আলোচনা ছিল '৫টা কেন বা হোয়াই' এবং 'জিদোকা’ নীতি। চলুন এই ভুলটার ওপরই একটু টয়োটা স্টাইলের '৫ হোয়াই' প্রয়োগ করে দেখা যাক। ১ম কেন, লেখায় হঠাত 'বাঙালি' শব্দমিুজমজন্টর টা এলো কেন? উত্তর - কারণ টাইপ করার সময় এ আই টুল ভুল করে লিখে ফেলেছে এটা। এখানে আমার নিজের মগজ না লিখে এ আই টুল লিখলাম। তাতে বিষয়টা আরও পরিষ্কার হবে। এআই টাইপ করার সময় ভুল শব্দ নির্বাচন করেছে। ২য় ‘কেন’, এ আই ভুল শব্দ নির্বাচন করল কেন? উত্তর, লিখছিলাম বাংলায়। এ আই হঠাত বাংলা ভাষায় চ্যাট করার কনটেক্সট এবং জাপানি ইতিহাসের কনটেক্সটকে গুলিয়ে ফেলেছে। ৩য় ‘কেন’, কনটেক্সট গুলালো কেন? উত্তর, কারণ ব্যাকগ্রাউন্ড অ্যালগরিদমে 'বাঙালি' এবং 'জাপানি' দুটো শব্দই একই সাথে সক্রিয় ছিল এবং সঠিক ফিল্টারিং হয়নি। আর লেখাটা ফিরে পড়তে গিয়েই ভুলটা ধরা পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে লেখার পরের অংশ যাওয়ার আগে থেমে যেতে হলো। এই যে সাথে সাথে ভুলটা ধরে আমারই মগজ আমাকেই থামিয়ে দিল, ওটাই হলো একদম খাঁটি 'জিদোকা' ! মগজ যেন সেই গাড়ি কারখানার 'অ্যান্ডন কর্ড' বা বেল্টের দড়ি ধরে টান দিল, আর আমাদের আলোচনার মোক্ষম লাইনটা এক মুহূর্তে থেমে গিয়ে ভুলটা শুধরে নিল। কিছু বোঝা গেল? ঘুরিয়ে পড়ে নিন আর একবার। ক্রিস্টাল ক্লিয়ার হয়ে যাবে। ১৯৫০-এর দশকে টয়োটা মোটরসের কিংবদন্তি প্রযুক্তিবিদ এবং 'টয়োটা প্রডাকশন সিস্টেম'-এর জনক তাইইচি ওহনো এই পদ্ধতিকে কারখানার প্রতিটি কর্মীর জন্য বাধ্যতামূলক করেন। ওহনো বলতেন, "টয়োটা উৎপাদন পদ্ধতির বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিই হলো পাঁচটি 'কেন'-র পুনরাবৃত্তি করা। যখনই কোনো ভুল হবে, পাঁচবার কেন জিজ্ঞেস করো। তাহলেই উত্তর বেরিয়ে আসবে এবং একই ভুল দ্বিতীয়বার হবে না।" এখানে এবার তিনটি ঐতিহাসিক ও বাস্তব উদাহরণ দেওয়া যাক। এই পদ্ধতিটি যে কেবল যান্ত্রিক ত্রুটি খোঁজার জন্য নয়, বরং প্রশাসনিক, ঐতিহাসিক এবং প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে কতটা কার্যকর, তা পরের বাস্তব উদাহরণগুলো থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
১. ওয়াশিংটন মনুমেন্টের ক্ষয় রোধ। প্রশাসনিক ও পরিবেশগত উদাহরণ বলতে পারেন একে।
আমেরিকার ঐতিহাসিক 'ওয়াশিংটন মনুমেন্ট'-এর পাথরগুলো খুব দ্রুত ক্ষয় হয়ে যাচ্ছিল। যত দিন যায় হেরিটেজ কমিটির কাছে এটা মাথা ব্যথার কারন হয়ে ওঠে। কী করা যায়, কী করা যায়। তারা তখন প্রথাগত আধুনিক কেমিক্যাল ব্যবহার না করে এই '৫ কেন বা হোয়াই' পদ্ধতি প্রয়োগ করেন।
১ম ‘কেন’ - মনুমেন্টের পাথরগুলো এত দ্রুত ক্ষয়ে যাচ্ছে কেন? উত্তর, কারণ পাথরগুলো পরিষ্কার করার জন্য খুব কড়া ও ক্ষতিকারক ডিটারজেন্ট ব্যবহার করতে হচ্ছে।
২য় ‘কেন’, এত কড়া ডিটারজেন্ট ব্যবহার করতে হচ্ছে কেন? উত্তর, কারণ মনুমেন্টের গায়ে প্রচুর পরিমাণে পাখির বিষ্ঠা লেগে থাকে, যা সাধারণ সাবানে ওঠে না।
৩য় ‘কেন’, মনুমেন্টে এত বিপুল পরিমাণ পাখি আসে কেন? উত্তর, কারণ সেখানে প্রচুর মাকড়সা থাকে, যা খেতে পাখিগুলো দল বেঁধে আসে।
৪র্থ ‘কেন’, মনুমেন্টে এত মাকড়সা আসার কারণ কী? উত্তর, কারণ সন্ধ্যার সময় মনুমেন্টকে আলোকিত করার জন্য চড়া আলো জ্বালানো হয়। ওই আলো প্রচুর পোকা-মাকড়কে আকর্ষণ করে। আর সেই পোকা খেতে মাকড়সারা আসে।
৫ম ‘কেন’, সন্ধ্যের সময় চড়া আলো জ্বালানো হয় কেন? উত্তর, পর্যটকদের দেখার জন্য।
তবে দেখা গেল, আলো যদি গোধূলির ঠিক ১৫ মিনিট আগে না জ্বালিয়ে, সূর্যাস্তের ৩০ মিনিট পরে জ্বালানো হয়, তবে পোকা-মাকড়ের আগমন নব্বই শতাংশ কমে যায়।
সুতরাং এসে গেল স্থায়ী সমাধান। তারা আলোর সময়সূচি সামান্য পরিবর্তন করে দিলেন। ফলে পোকা কমে গেল, মাকড়সা আসা বন্ধ হলো, পাখিও আর এলো না এবং কড়া ডিটারজেন্ট ব্যবহারের প্রয়োজন ফুরিয়ে পাথর রক্ষা পেল। কোটি কোটি টাকার রাসায়নিক খরচ বেঁচে গেল মাত্র ১৫ মিনিটের বুদ্ধিদীপ্ত সিদ্ধান্তে!
২. নাসার মঙ্গল অভিযান ও 'মার্স ক্লাইমেট অরবিটার' বিপর্যয় । মহাকাশ বিজ্ঞানের ট্র্যাজেডি। ১৯৯৯ সালে নাসার ১২৫ মিলিয়ন ডলারের 'মার্স ক্লাইমেট অরবিটার' মহাকাশযানটি মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করামাত্রই ধ্বংস হয়ে যায়। পরে নাসার তদন্ত দল যখন '৫ হোয়াই' বিশ্লেষণ করে, তখন এক চরম সত্য বেরিয়ে আসে।
১ম ‘কেন’, মহাকাশযানটি ধ্বংস হলো কেন? উত্তর, কারণ এটি মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলের বড্ড কাছাকাছি চলে গিয়েছিল, যার ফলে অতিরিক্ত তাপে এটি পুড়ে যায়।
২য় ‘কেন’ - এটা নির্ধারিত কক্ষপথের চেয়ে এত নিচে নামল কেন? উত্তর: কারণ এর নেভিগেশন সফটওয়্যারটি ভুল হিসাব করেছিল।
৩য় ‘কেন’, সফটওয়্যার ভুল হিসাব করল কেন? উত্তর, কারণ দুটি ভিন্ন ইঞ্জিনিয়ারিং টিম দুই ধরনের পরিমাপ একক ব্যবহার করেছিল। নির্মাণকারী সংস্থা লকহিড মার্টিন হিসাব করেছিল ব্রিটিশ একক-এ। আর নাসা হিসাব করেছিল আন্তর্জাতিক একক-এ। ডেটা ট্রান্সফারের সময় এই রূপান্তরটি করা হয়নি।
৪র্থ ‘কেন’, এই বিশাল অসঙ্গতি পরীক্ষার সময় ধরা পড়ল না কেন? উত্তর, কারণ কোড পরীক্ষা ও কাজের মান যাচাই করার সময় দুই সংস্থার তথ্য ঠিকমতো মিলিয়ে দেখার কোনও নির্দিষ্ট নিয়ম ছিল না।”
৫ম ‘কেন’, এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ যাচাইয়ের নিয়ম কেন বাদ পড়ল? উত্তর: কারণ তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করা এবং খরচ কমানোর চাপ ছিল। সেই কারণে ম্যানেজমেন্ট দ্রুত কাজ শেষ করতে গিয়ে তথ্য দু’বার মিলিয়ে দেখার নিয়ম এড়িয়ে গিয়েছিল।
এর থেকে শিক্ষা নিয়েছিল নাসা। এই ঘটনার পর নাসা তাদের মিশন ম্যানেজমেন্টের মূল কাঠামো বদলে ফেলে। এবং যেকোনো যৌথ প্রকল্পে একক পরিমাপের কঠোর নিয়ম চালু হয়। যৌথ প্রকল্পে একই ধরনের মাপ ব্যবহার ও আলাদা একটি যাচাইকারী দল রাখা বাধ্যতামূলক করে।
৩. আধুনিক প্রযুক্তিগত উদাহরণ হিসেবে এখানে দেখবো নেটফ্লিক্স বা অ্যামাজনের 'সার্ভার ডাউন'-এর ঘটনা।
ধরুন, কোনো এক শুক্রবার রাতে হুট করে নেটফ্লিক্সে ভিডিও চলা বন্ধ হয়ে গেল। ইঞ্জিনিয়াররা দ্রুত সার্ভার আবার চালু করে দিলেন। কিন্তু তাঁরা শুধু সমস্যাটা ঠিক করেই থেমে থাকেন না। কেন এমন হলো, তা খুঁজতে বসেন ‘৫ হোয়াই’ নিয়ে।
১ম ‘কেন’, ব্যবহারকারীরা লগ-ইন করতে পারছিলেন না কেন? উত্তরকারণ মূল ডেটাবেস সার্ভারটি হঠাৎ কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছিল ২য় কেন’, ডেটাবেস হঠাৎ কাজ করা বন্ধ করে দিল কেন? উত্তর, কারণ কম্পিউটারের মেমোরিতে আর জায়গা ছিল না। ৩য় কেন, মেমোরিতে আর জায়গা ছিল না কেন? উত্তর, কারণ নতুন একটি সুবিধা যোগ করার পর একটি ভুল কোড বারবার চলতে শুরু করেছিল। আর চলতে চলতে সে কম্পিউটারের মেমোরির প্রায় সবটাই খেয়ে ফেলছিল! ৪র্থ কেন: এই ভুল কোডটি মূল সার্ভারে চলে গেল কীভাবে? উত্তর: কারণ পরীক্ষা করার সময় যে ব্যবস্থা ছিল, সেটি এই ধরনের ভুল ধরতে পারেনি। ৫ম কেন: পরীক্ষার সময় এই ভুল ধরা পড়ল না কেন? উত্তর: কারণ পরীক্ষায় একজন-দু’জন ব্যবহারকারী একসঙ্গে ব্যবহার করলে কী হয়, শুধু সেটাই দেখা হয়েছিল। কিন্তু একসঙ্গে যদি হাজার হাজার মানুষ এসে হাজির হয়, তখন কী হবে, সেটা পরীক্ষা করা হয়নি। এর পরে এলো স্থায়ী সমাধান। শুধু ভুল কোডটি ঠিক করেই ইঞ্জিনিয়াররা থামলেন না। তাঁরা পরীক্ষার ব্যবস্থাতেও নতুন নিয়ম যোগ করলেন। একসঙ্গে অনেক মানুষ ব্যবহার করলে সিস্টেম কীভাবে সামলায়, সেটাও আগে থেকে পরীক্ষা করতে হবে। ফলে ভবিষ্যতে এমন ভুল হলে তা আসল ব্যবহারকারীদের কাছে পৌঁছনোর আগেই ধরা পড়বে। ফলে ভবিষ্যতে কোনো জুনিয়র প্রোগ্রামার ভুল কোড লিখলেও তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে আটকে যায়, তার আগাম ব্যবস্থাও হয়ে থাকল।
কিন্তু ‘কেন’ প্রশ্নটি জীবনের যেকোনো ক্ষেত্রে ম্যাজিকের মতো কাজ করে।
"৫ হোয়াই বা কেন" পদ্ধতির মূল সৌন্দর্য হলো এর মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর। এটি কোনো সমস্যা হলে "কে করেছে?" এই ব্লেম-গেম বা দোষারোপের সংস্কৃতি থেকে বের করে এনে "কেন হয়েছে? তারই খোঁজ করে। অর্থাৎ সিস্টেমের ত্রুটি খোঁজার দিকে মনোযোগ ঘোরায়।
ভারতীয়রা অবশ্য আরও ভাল বুঝতে পারছেন, কেন, প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। প্রশ্নের মুখে পড়লে তবেই না দায় নেওয়া বা স্বীকারের ব্যাপার ঘটে। ভারতের মোদি সরকার কিছুতেই ‘কেন’র মুখোমুখি হতে রাজি নন। ফলে দায় নেওয়ারও কিছু নেই। চাপে পড়ে দায় নিয়ে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন দেশের শিক্ষামন্ত্রী।
মানুষ ভুল করতেই পারে, কিন্তু একটি মজবুত সিস্টেম বা প্রক্রিয়া সেই ভুলকে আটকে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। এই পদ্ধতিটি আমাদের শেখায় যে, আগাছা দূর করতে হলে শুধু ওপরের পাতা ছাঁটলে চলে না, কোদাল নিয়ে শিকড়টাকেই উপড়ে ফেলতে হয়।
যখন আপনার অফিসে কোনো প্রজেক্ট দেরি হবে, কিংবা নিজের ব্যক্তিগত জীবনে কোনো পরিকল্পনা ব্যর্থ হবে—হতাশ না হয়ে শান্ত হয়ে বসুন। নিজেকে বা নিজের টিমকে পরপর পাঁচবার জিজ্ঞেস করুন: "কেন?"। দেখবেন, পঞ্চম উত্তরটি আপনাকে এমন এক সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করাবে, যা আপনার আগামী দিনের সব পরিকল্পনা চিরতরে বদলে দেবে।
কেন এটি এত জনপ্রিয়? কারন এটা সহজ ও কার্যকরী। এর জন্য কোনো জটিল বৈজ্ঞানিক ফর্মুলা বা পরিসংখ্যানের প্রয়োজন হয় না। তাছাড়া এটাই স্থায়ী সমাধান। সাময়িক জোড়াতালি তাপ্পি দেওয়ার বদলে সমস্যার একদম গভীরে গিয়ে চিরতরে তা দূর করতে সাহায্য করে।
এছাড়াও, দলগত কাজে সহায়ক এই নীতি। যেকোনো টিমের মানুষ একসঙ্গে বসে খুব দ্রুত এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মূল সমস্যা চিহ্নিত করতে পারেন। এখানে একটা কথা। নাম "৫ হোয়াই" হলেও, মূল কারণ খুঁজে পেতে সবসময় যে ঠিক ৫ বারই কেন বলতে হবে তা নয়। কখনো ৩ বার বা কখনো ৭ বারও "কেন" জিজ্ঞাসা করতে হতে পারে।